যদি এমন হত

ব্যতিক্রম ছাড়া প্রতিদিন যেমন সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠি আজও উঠলাম। 
স্বাস্থ্যগত কারণে প্রতিদিন সকালে হাঁটি। হাঁটবার জন্য ঘর থেকে বেড়িয়ে পড়লাম। আমরা ওই সময়টাকে বলে থাকি ভোর বেলা। 
আমি লক্ষ্য করলাম অল্পকিছু সংখ্যক লোক যাদের বেশির ভাগই আমার মত হাঁটতে বেড়িয়েছে। আর অল্পকিছু সংখ্যক লোক দিনের কাজ কর্ম, ব্যবসা বাণিজ্য শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। 
আমি ঘরে ফিরে গেলাম, নাস্তা সারলাম এবং আবার বেড়িয়ে পরলাম। 
ততক্ষণে বিভিন্ন পেশার লোকেরা তাদের নিজ নিজ অফিস বা কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে এসেছে। দোকান পাটও খুলেছে, বিভিন্ন ধরণের যান বাহনও চলতে শুরু করেছে শহরের অলিতে গলিতে। 
আমি রিক্সায় চড়ে শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি শপিং মলের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। অস্বাভাবিক কোন কিছুই লক্ষ্য করি নি। বরং লক্ষ্য করলাম সবকিছুই ঠিকঠাক এবং স্বাভাবিক গতিতে চলছে। 

বাংলাদেশের রংপুর জেলার অন্তর্গত কাউনিয়া উপজেলার একটি বিশেষ জায়গায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ওই প্রস্তুতির কয়েক ঘন্টার মধ্যে কোথায় কি ঘটেছে না ঘটেছে তার কোন কিছুই দেখিওনি আর জানতেও পারি নি। 
দূর পাল্লার ওই বাসের জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম আর রংপুরের কাউনিয়া গামী রাজপথের দুই ধারের যে সুন্দর প্রকৃতি সেই সৌন্দর্য উপভোগ করছিলাম। 
সম্ভবত আমি বাস্তব জীবনের সবকিছু ভুলে গিয়ে পথের দুই ধারের অবারিত সবুজ প্রকৃতির মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। 
আমার একদমই খেয়াল ছিল না বাসটা কতদূর এসছে আর কত সময় পর কাউনিয়া রেলগেটে যেয়ে পৌঁছাবে। 
কিন্তু বাসটা যখন হঠাৎ থেমে গেল তখন যেন আমার সব্বিত ফিরে এল। 
অন্যান্যদের মত আমিও লক্ষ্য করলাম বেশ কিছু সংখ্যক লোক যাদের অধিকাংশই যুবক হাতে লাঠি সোটা এবং দেশীয় অস্ত্র সস্ত্র নিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। ফলে সব ধরণের যান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। 
একটু পর স্থানীয় একজন লোকের কাছে জানতে পারলাম দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দলের দুই দল লোক একটি বিশেষ জায়গার উপর আধিপত্ত বিস্তারের জন্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। আর তা করতে গিয়ে তারা এতটাই মারমুখী ও রাগান্বিত হয়ে পড়েছে যে বিপক্ষের লোকদের মেরে ফেলতেও দ্বিধা করবে না। 
এটি তারা করছে রাজনৈতিক লাভের জন্য। কিন্তু আমার কাছে এই ঘটনাটি ছিল অতিতে ঘটে যাওয়া এ রকম আরও কিছু ঘটনা মনে করার ও চিন্তা করার একটা উৎস। 
আমি দেখেছি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বার্থ সিদ্ধির জন্য আপন ভাই বোনেরা সংঘাতে লিপ্ত হয়, তারা একে অপরকে পছন্দ করেনা, একে অপরকে হিংসা করে, ঘৃনা করে। মানুষের মধ্যে যে বৈষম্য, বিভেদ এবং প্রচন্ড রকমের শ্রেণিভেদ রয়েছে তাও আমি দেখেছি। 
আমাদের এই সমাজেই অনেক লোক আছে যারা তাদের ন্যায্য অধিকার বঞ্চিত হচ্ছে। অন্য মানুষদের দ্বারা প্রতি নিয়ত ঘৃনিত ও অসম্মানিত হচ্ছে। 
আমাদের আশে পাশেই অসংখ্য মানুষ আছে যারা গোঁড়া ও ধর্মান্ধ এবং সামান্য ব্যাপারেও এতটাই উগ্র ও রাগান্বিত হয়ে উঠে যে অমানবিক কাজ করতেও দ্বিধা করে না। 
নীলফামারী জেলায় জলঢাকা উপজেলার গংগাছড়া ইউনিয়নের অন্তর্গত ঠাকুরপারা গ্রামের সংখ্যা লঘু হিন্দুদের উপর সাম্প্রতিক আক্রমন ও প্রায় ২৫টির মত ঘর বাড়িতে আগুন লাগানোর ঘটনাই তার প্রমাণ। 
কিন্তু বন্ধু মনোভাবাপন্ন, দয়ালু, সহানুভূতিশীল, উদার, ত্যাগী এবং দাতা প্রকৃতির মানুষের সংখ্যাও কম নয়। 
যদি আমি আমার নিজের অভিজ্ঞতার একটু গভীরে যাই তাহলে আমাকে অবশ্যই বলতে হবে আমি খুব একটা গোছানো প্রকৃতির বা শৃংখলাবদ্ধ মানুষ নই। 
আমি আমার জীবনে অসংখ্যবার অসংখ্য ভুল করি কিন্তু যখনই ভুল করি, ভুল হয়ে যায় তখনই তা সংশোধনের জন্য সাহায্য সহযোগীতা, উপদেশ, মরামর্শ অথবা যা কিছু প্রয়োজন তার সবকিছুই আমি লাভ করি। 
আমি অনেকের সংগেই খারাপ আচরন বা ব্যবহার করেছি কিন্তু তাদের কাছ থেকেই আবার নি:শর্ত ক্ষমা পেয়েছি। 
এজন্যই নিশ্চুপ হয়ে ভাবছিলাম হিংসা, ঘৃণা, নিন্দা, বিভেদ, নির্দয়, নিষ্ঠুরতা, স্বার্থপরতার পরিবর্তে মানুষের মধ্যে যদি প্রেম, ভালবাসা, দয়া, মায়া, সহযোগীতা, সহানুভূতি, সহমর্মিতা, শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পেত তাহলে দেশ, দশ তথা বিশ্ব মানবতার বড় কল্যাণ হত। 
--- --- --- 
কে সি মিলান 
জলঢাকা উপজেলা বাজার, নীলফামারী, বাংলাদেশ 
১৮ নভেম্বর ২০১৭ 

Comments